top of page

বর্তমান ভারতে শিক্ষা এবং বিশ্লেষণ ধর্মী ইতিহাস শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

যে কথা গুলো বলতে যাচ্ছি সেগুলো অনেকেরই অপছন্দ হতে পারে, কিন্তু এগুলো না বললে আমি নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকব।

একটু ঘুরিয়ে ব্যাপারটা শুরু করি। যদি বেশ কিছু উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষারত ছাত্র

ree

কে জিজ্ঞেস করা হয় যে তার সবথেকে অপ্রিয় বিষয় কোনটা তাহলে সম্ভবত বেশ কিছুজনের উত্তর হবে ইতিহাস। অথচ দেখা যায় যে যে কোনো উন্নত দেশে বিদ্যালয়ে পঠন পাঠনে নিজেদের ইতিহাসের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের সমস্যাটা ঠিক কোথায় ?

একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই দেখা যাবে যে সমস্যা ইতিহাস নয়, সমস্যা আমাদের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাতেই। ব্রিটিশ আমলে যেভাবে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে গঠন করা হয়েছিল তার একটা বড় অংশ ছিল কেবলমাত্র মুখস্থ করা। একসময় নাকি সরকারি চাকরি পাওয়ার যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল প্রার্থীর জানা ইংরেজি শব্দের সংখ্যা ! পড়াশোনার বিষয়বস্তু ভাল করে বুঝে আত্মীকরণ করার ওপরে আদৌ বিশেষ জোর দেওয়া হতো না। দুঃখের বিষয় এই যে স্বাধীনতার বহু বছর পরেও এই একই ব্যবস্থা বহাল তবিয়তে বজায় রয়েছে। আর যেখানে বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর হয় ছাত্রের শিক্ষার একমাত্র মাপকাঠি সেখানে মূল লক্ষ্যই হয়ে ওঠে যেন তেন প্রকারেন বেশি নম্বর পাওয়া, সেটা বই মুখস্থ করেই হোক, বা কোনো শিক্ষকের দেওয়া "নোটস" গলাদ্ধকরণ করেই হোক, বা সরাসরি চুরি করেই হোক (চুরির অবশ্য অনেক প্রকার আছে, সেসবে গিয়ে আর কাজ নেই )।

তবে এই জরাজীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা কি শুধুই দুর্ঘটনাবশত আমাদের দেশে শাসন করে চলেছে ? সেটা ভাবা কিন্তু একদমই ভুল। ব্রিটিশরা যাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে গিয়েছিল তারা মনেপ্রাণে ছিল ব্রিটিশদেরই সমর্থক। শঠতা এবং চাতুর্য্যে তারাও কিছু কম ছিল না। প্রাক্তন প্রভুদের মতো তারাও বুঝেছিল যে মানুষ গড়ার শিক্ষার যদি প্রচলন ঘটে তবে শাসকের ধূর্তামি সহজেই জনগণের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে, তার চেয়ে বরং পুরোনো প্রথাই ভাল। আরো ভাল হয় যদি এই শিক্ষাব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে কোনো বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের দিকে ঠেলে দিয়ে ছাত্রদের নিজেদের সভ্যতা সংস্কৃতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে দেওয়া যায়, এবং এই অপচেষ্টাও কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে সাফল্য লাভ করেছে। তবে সবথেকে কার্যকরী হল শিক্ষাব্যবস্থাকে ঝাড়ে বংশে উঁপরে ফেলা, তাহলেই আর কোনো ঝামেলা নেই। তার তিনটে অঙ্গ হল, প্রথমত সরকারি বিদ্যালয় ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া, দ্বিতীয়ত শিক্ষা ক্ষেত্রে অযোগ্য লোককে ঢুকিয়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই সমাজের কাছে সন্দেহভাজন করে দেওয়া, এবং তৃতীয়ত শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা যেন জীবনধারণের উপায় খুঁজে না পেয়ে হয় দেশান্তরে পাড়ি জমায় নয় শাসকের অনুগত ভৃত্যের মত জীবন কাটাতে বাধ্য হয় সেই ব্যবস্থা করা। এবং লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে আমাদের রাজ্যে যেসব রাজনৈতিক দল শাসন করে গেছে বা করছে তারা কিন্তু এসব ব্যবস্থারই প্রয়োগ করেছে ! ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে ; একসময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা বাঙালি জাতি আজ অশিক্ষার ঘোর অন্ধকারে নিমগ্ন। ফলে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে নাবালক বিবাহ, মাতৃত্বকালীন মৃত্যু, শিশু মৃত্যু এবং সেই সঙ্গে মাদকাসক্তি, সমাজ বিরোধী মনোভাব এবং জায়গায় জায়গায় দুষ্কৃতীদের তান্ডব।

অবশ্য বাঙালি জাতির অবনমনের কারণ কেবলমাত্র অশিক্ষা নয়, বরং নিজেদের অতিরিক্ত শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান মনে করে এমন এমন কিছু করা যা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ সহজে করে না, উপরন্তু কোনো প্রকৃত শুভাকাঙ্খী ভুল ধরিয়ে দিলে নিজেদের না শুধরে সেই উপকার করা মানুষকেই জনসমক্ষে হেয় করা। এই সুযোগ নিয়েই চূড়ান্ত বাংলা ও ভারত বিরোধী এবং এক বিশেষ আদর্শে চালিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী বাঙালির মগজে ক্রমাগত ভাবে বিষ ঢেলে চলেছে। একদিকে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পেছনে এদের সক্রিয় সমর্থন ছিল, অপরদিকে ভিটে মাটি সহায় সম্বল হারা বাঙালিকে তারা বুঝিয়ে গেছে যে লড়াইটা নাকি জাতের নয়, ভাতের। অথচ পূর্ববঙ্গে (এক পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় ছাড়া ) কস্মিনকালেও ভাতের অভাব হয়েছিল বলে জানা যায়নি ! যেখানে কেবলমাত্র সনাতন ধর্ম পালন করার জন্য লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের সম্পত্তি অবাধে লুন্ঠন করা হয়েছিল, মহিলাদের সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছিল পূর্ববঙ্গে (এবং এখনো বাংলাদেশে হয়ে চলেছে), সেখানে উদ্বাস্তুদের কানের কাছে ধর্মনিরেপেক্ষতার ফাঁকা বুলি আউড়ানো কি পাগলের প্রলাপ মনে হয় না ? অপরদিকে রাজ্যশিল্প পরিকাঠামোকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়ে শিক্ষিত ভদ্র বাঙালির মুখের ভাত কেড়ে নেওয়া কি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ নয় ? কিছু বেতনভুক বুদ্ধিজীবীর সাহায্যে একটি সমৃদ্ধিশালী রাজ্যকে যেভাবে শ্মশানে পরিণত করা হয়েছে তার নিন্দার কোনো ভাষা আছে কি ? বর্তমান কালে তারা ক্ষমতায় না থাকলেও সেই বিষাক্ত পন্থা কি আমাদের পথ ছেড়ে গেছে ? বরং উল্টোটাই সত্য, ওই গরল আমাদের কণ্ঠে ভীষণভাবে চেপে বসেছে, এবং স্বয়ং মহাদেবেরও হয়তো একে ধারণ করার শক্তি নেই।

দেশভাগের সময়ে বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনা তো অনেক শুনি, বাস্তুচ্যুত বাঙালিরা নোয়াখালী থেকে টিপরা, বা ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা হয়ে পাবনা থেকে যশোর ছুটে বেরিয়েছে শুধু এক ক্ষীণ আশায় যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে নিজের ভিটেতে ফিরে আসতে পারবে (এবং সব জায়গাতেই হয়তো শুনতে হয়েছে যে এখানেই থেকে যাও, আমাদের এখানে ওসব কোনো ঝামেলা নেই ), কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। আর সম্প্রতি আমরা কি দেখলাম : মুর্শিদাবাদ জেলায় একতরফা মার খেয়ে সর্বস্ব হারিয়ে সনাতন ধর্মী বাঙালিদের দলে দলে গঙ্গা পেরিয়ে মালদা জেলায় আশ্রয় নিতে হয়েছে (সেই দৃশ্য কি মনে পড়ছে যখন এভাবেই মরিয়া হয়ে পূর্ববঙ্গের পদ্মার উত্তরের বাসিন্দাদের নদী পেরিয়ে গোয়ালন্দে এসে ট্রেন ধরতে হয়েছিল?)। তাও তো ভাগ্য ভাল যে মালদায় ওই সাম্প্রদায়িক উত্তাপ ছড়ায়নি, নইলে যে কি হত তা ভাবতেও গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। আর পুরো সময়টা রাজ্য প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে (অনেকটা সেই ১৯৪৬ এর সময়ের সুরাবর্দির পুলিশ দপ্তরের মতোই )। বর্তমান শাসকদল তো দূরের কথা, প্রাক্তন শাসকদল, যাদের দুজন সমর্থককে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে তারাও বাঙালিদের পক্ষে দাঁড়ায়নি (তাদের প্রথম প্রতিবেদনে তো ওই দুজনের নাম পর্যন্ত ছিল না, পরে নির্ঘাত তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে সেগুলো যোগ করতে বাধ্য হয়েছে)। অর্থাৎ বাঙালিদের কি হয় তাতে এদের কিছুই আসে যায় না, শুধু নিজেদের ভোটবাক্স অটুট থাকলেই হল। এদিকে সুদূর গাজার কথায় এদের কুম্ভীরাশ্রু দেখলে তো মনে হয় যে নির্ঘাত শিশির ভাদুড়ী আবার জন্ম নিয়েছেন !

স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মাপকাঠিতেই কোনো দেশ বা রাজ্যের প্রকৃত উন্নয়ন অনুধাবন করা যায়। সেখানে আজ পশ্চিমবঙ্গে চিকিসক হন ধর্ষিত এবং শিক্ষক হন পদদলিত। আইনকানুন এখানে প্রহসনে রূপান্তরিত হয়েছে। রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সমাজবিরোধীদের হাতে চলে গেছে (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা আবার এক বিশেষ ধর্মাবলম্বীও বটে )। এমত অবস্থাতেও যদি বাঙালি নিজের মাথাটা বালির মধ্যে থেকে বের করতে না পারে তবে আর দুই দশকের মধ্যেই হয়তো পায়ের তলায় কোনো মাটিই থাকবে না। রবি ঠাকুরের সোনার বাংলা ঊষর মরুভূমিতে পরিণত হবে (বাংলাদেশের অবস্থা দেখলেই সেটা অনুমান করা যায়, যে অঞ্চল একসময় সারা ভারতের মানুষের ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে পারতো সেই অঞ্চলে প্রতিনিয়ত সব ধরণের খাদ্যসামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে ), এবং বাঙালিকে ভারতের প্রতিটা জায়গায় বিষ্ঠা ও নিষ্ঠীবনের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হবে।

ইতিহাসের কথা বলছিলাম না ? সেই ইতিহাসকে বিকৃত করে তো আমাদের প্রকৃত দেশনায়কদের লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্বাসিত করা হয়েছে, এবং ক্রমাগত মার খাওয়ার একঘেয়ে গল্প শুনতে শুনতে শুধু বাঙালি নয়, সমগ্র ভারতবাসীরই ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ যে তলানিতে চলে যাবে তাতে আর আশ্চর্যের কি ?! যে ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা না নিলে পূর্বপুরুষদের ভুলগুলোই আবার করে করব, সেই ইতিহাস এখন আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত (দেশভাগের ফলে বাঙালির চূড়ান্ত দুর্দশার কথা তো কোন ছাড়, কাশ্মীরের সনাতন ধর্মীদের নিজভূমে প্রবাসী হওয়ার কাহিনী নাকি আদতে গল্প সেটাই তো আমাদের মাথায় পেরেক ঠোকার মত করে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং এখনো হয়ে চলেছে )। আর এর মধ্যেও কিছু রাজনীতিকের মুখে আবার ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভূয়সী প্রশংসা শোনা যায় (বিশ্বের সর্বাধিক সমৃদ্ধ রাষ্ট্র/অঞ্চল কে দারিদ্র্যের শেষ সীমায় ঠেলে নিয়ে যাওয়া অবশ্য কোনো সহজ কাজ নয়, এটা নিঃসন্দেহে কৃতিত্ত্বের দাবি করে )। এরকম পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ ভারতবাসী হয়ে আমার যেটুকু সাধ্য সেটাই আমি করেছি। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবের বীরগাঁথায় পরিপূর্ণ আমার বই "THE OTHER SIDE OF HISTORY : The Unsung annals behind India s independence " এখন আপনাদের সামনে উন্মুক্ত। যেসকল মানুষ জাতীয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিঃস্বার্থ ভাবে কোনো বিপদের তোয়াক্কা না করে দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাঁদের আত্মত্যাগ, অনুশাসন এবং সাহসিকতার কাহিনী যদি বাঙালি এবং সমগ্র ভারতবাসীকে সঠিক পথ দেখাতে সক্ষম হয় তাহলে আমার প্রচেষ্টা সফল বলে আমি মনে করব।

বি দ্রঃ

১। বাঙালি হতে গেলে কেবলমাত্র বাংলাভাষী হওয়াই যথেষ্ট নয়, বাংলার সভ্যতা সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকা আবশ্যক।

২। আমার বইটা Amazon এ পাওয়া যাচ্ছে। এই site এর Home page এই link দেওয়া আছে। এছাড়া Amazon এর Search bar এ নামটা লিখে সহজেই বের করা যাবে।

 
 
 

Comments


bottom of page