top of page

কিছু পুরোনো কথা, এবং অন্যান্য...


ree

কিছু স্মৃতিচারণ করব। আশা করি আপনাদের বিরক্তি লাগবে না!

২০০৪ এ আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিই (নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয় থেকে) এবং অত্যন্ত ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চমাধ্যমিক এর পাঠ গ্রহণের জন্য রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিক মহাবিদ্যালয় নরেন্দ্রপুরে ভর্তি হই (আমরাই এই প্রতিষ্ঠানের উচ্চমাধ্যমিকের শেষ ব্যাচ, এর পরের বছরই এই পাঠক্রম বিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হয়)। আমাদের সময়ে সম্ভবত এই রাজ্যের কোনো বিদ্যালয়েই career counseling বলে কিছু ছিল না, ভাল ছাত্র মানেই হয় ডাক্তার নয় ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে এই ধারণাই বদ্ধমূল ছিল। আমার প্রথমটার ওপরেই আগ্রহ ছিল (অবশ্য অঙ্কে যেমন পারদর্শী ছিলাম তাতে দ্বিতীয়টার দিকে হাত বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষ ভরসা ছিল না!), অগত্যা পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, জীবন বিজ্ঞান আর অঙ্ক নিয়েই পরবর্তী দুই বছর চলার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

কিন্ত এই ঠাঁই যে সহজ নয় সেটা (অবশ্য জানাই ছিল, মাধ্যমিকের পরে উচ্চাভিলাষী ছাত্ররা কেউই হাত গুটিয়ে বসে থাকে না) ভালোভাবেই অনুধাবন করা গেল কিছুদিনের মধ্যেই। সত্যি বলতে কলেজে পড়ানোর ধরণ স্কুলের থেকে আলাদা, একই বিষয়ের বিভিন্ন অধ্যায় একসাথে পড়ানোর ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলাম না, তার ওপর সময় এবং যত্ন নিয়ে পড়ানোর কোনো অবকাশ এখানে ছিল না। কিছু মাসের মধ্যেই চোখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলাম, এবং কঠোর প্রতিযোগিতায় (সেই সময়ে মাধ্যমিকে সবথেকে ভাল ফল পাওয়া ছাত্ররা সহপাঠী ছিল বলে কথা!) যে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছিলাম তার প্রমাণ পেয়ে গেলাম অর্ধ বার্ষিকী পরীক্ষার ফলেই।

২০০৫ এর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, যখন মনের জোর অনেকটাই কমের দিকে ছিল, তখন দেবদূতের মত সামনে এল একটা বই। ১৩ তারিখ ছিল সরস্বতী পুজো, আর ১৪ তারিখেও ছুটি ছিল। ১২ তারিখ সন্ধেবেলায় হাতে এল শৈলেশ দে বিরচিত "আমি সুভাষ বলছি"। স্কুলে পড়াকালীন ইতিহাসে আমার যথেষ্টই আগ্রহ ছিল, এবং মাধ্যমিক এর যা পাঠক্রম ছিল সেইমত পড়াশোনা করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্পর্কে কিছু ধারণা তো তৈরি হয়েই ছিল। তাই ইতিহাস আশ্রিত বিষয়বস্তু হাতে পেয়েই প্রচুর উৎসাহ নিয়ে পড়তে শুরু করেছিলাম। কিছু পাতা এগোনার পরেই বইটা গোগ্রাসে গিলতে থাকলাম। কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেল বুঝতেও পারলাম না। তারপর পড়ার ফাঁকে যখনই সময় পেতাম বইটা নিয়ে বসতাম। প্রায় ১০০০ পাতার বই শেষ করতে মাস পাঁচেক সময় লেগেছিল।

এত কথা বলার কারণ এই যে এই বই পড়ে ভারত মাতার নির্ভীক সন্তানদের বীরত্বের কাহিনী আত্মস্থ করে আমার হারানো মনোবল ফিরে পেলাম। ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা তো বিপুল মাত্রায় বদলে গেলই, এর সঙ্গে ভেতর থেকে যে উৎসাহের বান এল তার জেরেই এগিয়ে চলার শক্তি ফিরে পেলাম। তার ফলেই ২০০৬ এর উচ্চমাধ্যমিক এবং জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করলাম। এরপর চিকিৎসা বিদ্যা অধ্যয়নের সময়েও যখনই নিজেকে দুর্বল বলে মনে হয়েছে তখনই এই বই নিয়ে কিছু সময় কাটিয়েছি, এবং আশানুরূপ সুফলও পেয়েছি।

ভেবেছিলাম যে কর্মজীবনে প্রবেশ করে দেশের ও দেশবাসীর উন্নতির জন্য বড় কিছু করতে পারব। কিন্ত বাস্তবের রূঢ় কষাঘাতে এসব চিন্তা মরীচিকায় পরিণত হতে সময় লাগে না। জীবিকা অর্জনের জন্য রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছোটাছুটি করেই দিন কাটে। এবং সেই সময়েই চোখে পড়ে বাংলার মানুষের চূড়ান্ত (অর্থনৈতিক ও মানসিক) দুরবস্থা ও সামগ্রিক অবক্ষয়। একদিকে কিছু ভ্রান্ত আদর্শের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের ফলে অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, অপরদিকে চূড়ান্ত দুর্নীতিপরায়ন রাজনৈতিকদের ভ্রষ্টাচারের ফলে মানুষের শিরদাঁড়ার আর কোনো শক্তিই নেই। এই পরিস্থিতি আমার মত একজন নগন্য মানুষ তার সীমিত ক্ষমতায় কিই বা করতে পারে? "আমি সুভাষ বলছি" পড়ার পরে সশস্ত্র বিপ্লব সংক্রান্ত আরো অনেক বইপত্র পড়েছি। এসবে যা জেনেছি, যা বুঝেছি, তাই বাংলার ও ভারতের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস হল এই বই "THE OTHER SIDE OF HISTORY: The Unsung annals behind India's independence"।

এই বইয়ের কিছু বিশেষত্ব জানিয়ে রাখি। এই বইয়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবের ভূমিকার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ রয়েছে, এবং যথা সম্ভব সংক্ষিপ্ত ভাবে। সশস্ত্র বিপ্লবের কাহিনী গড়পড়তা ইতিহাসের বইয়ে খুব বেশি থাকে না, আর থাকলেও যেভাবে সেগুলো বর্ণিত হয় তাতে মনে হয় যে এগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা। কিন্ত সেটা যে সত্যি নয়, তার পেছনে অনেক পরিকল্পনা, অনেক স্বার্থত্যাগ, অনেক সাহস, বীরত্ব, এবং সর্বোপরি দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসা যে কাজ করেছিল, এবং এই সংগ্রাম যে প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল, সেই ধারণা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এই বইয়ের উদ্দেশ্য। এখানে এমন বহু তথ্য আছে যা সাধারণ ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে মেলে না, এবং প্রায় সব জায়গাতেই তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ২০ বছর এই বিষয়ে চর্চা করে এইটুকু আশ্বাস দিতে পারি যে এখানে যা তথ্য আছে সেগুলো সঠিক, এবং এই বই পড়ে সমঝদার পাঠক নিরাশ হবেন না। যাতে সমগ্র ভারতের মানুষের কাছে এই বীরগাথা পৌঁছে যেতে পারে তার জন্যই বইটা ইংরেজিতে লেখা হয়েছে। আমি যেভাবে লিখেছি তাতে আশা রাখি যে এই বই পড়ার জন্য কোনো শিক্ষিত মানুষের কাছে ভাষা অন্তত অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে না। যদি সুযোগ আসে তবে বাংলা অনুবাদ নিশ্চয় প্রকাশ করব।

স্বাধীনতার পরে ভারত বহু সংকটের সম্মুখীন হয়েছে এবং হয়েই চলেছে। এমত অবস্থায় সেই ধরণের মানুষ প্রয়োজন যারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে দেশের কাজের জন্য এগিয়ে আসবে (সেই কাজ সবসময়েই যে খুব কঠিন কিছু হতে হবে তা নয়, নিজেদের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখে, দেশের আইন কানুন মেনে চলেও দেশের উপকার করা যায়)। ভারতবাসীর অন্তরের ভীরুতাকে সাহসিকতায় পরিণত যদি করা সম্ভব হয় তাহলেই মনে করব যে এই গ্রন্থরচনা সার্থক হয়েছে।

 
 
 

Comments


bottom of page